চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বিমানবন্দরে বিরল ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য ও ইরানসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে শির জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফর শুরু হয়েছে। সফরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার ওয়াশিংটনের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানঘাঁটি জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে শি জিনপিং বিমান থেকে নামার পর তাঁকে স্বাগত জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। শির সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী পেং লিয়ুয়ান।
শিকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানঘাঁটিতে লালগালিচা বিছানো হয়। ট্রাম্প ও মেলানিয়া শি ও পেং লিয়ুয়ানের সঙ্গে হাত মেলান। পরে লম্বা কোট ও গ্লাভস পরা ট্রাম্প শির পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সামরিক ব্যান্ড দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে।
অভ্যর্থনার সময় দুটি বি-১ বোমারু বিমান উড্ডয়ন করলে বিকট শব্দে ৮০ বছর বয়সী ট্রাম্পকে চমকে উঠতে দেখা যায়। যুদ্ধবিমান দুটির গর্জনে তাঁর মুখে বিস্ময়ের অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। তবে শি জিনপিং নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
গত মে মাসে ট্রাম্প বেইজিং সফরকালে শি তাঁকে একই ধরনের বিমানবন্দর অভ্যর্থনা না জানানোর বিষয়টি ট্রাম্প উড়িয়ে দেন। শিকে স্বাগত জানানোর পর হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এটি একটি চমৎকার ছোট বৈঠক ও অভ্যর্থনা ছিল এবং তিনি মনে করেন, চীনা পক্ষ তা প্রশংসা করেছে।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর শি ও ট্রাম্পের এটি তৃতীয় বৈঠক। সফরসূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা ও আরও একটি বিমান প্রদর্শনী, ওভাল অফিসে বৈঠক এবং হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় ভোজ অনুষ্ঠিত হবে।
শুক্রবার সকালে দুই প্রেসিডেন্ট ও তাঁদের স্ত্রীরা হোয়াইট হাউসে চা পান করবেন। পরে তাঁরা ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শন করবেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল দলিল সংরক্ষিত রয়েছে। এরপর শির সফর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
এই শীর্ষ বৈঠক থেকে বড় ধরনের অগ্রগতির প্রত্যাশা কম। বিশ্লেষকদের মতে, দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রেখে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ট্রাম্প বুধবার নিশ্চিত করেছেন, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের যুদ্ধের বিষয়টিও আলোচনা হবে। এর আগে সংঘাত চলাকালে বেইজিং তেহরানকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে বলে খবর প্রকাশিত হলেও ট্রাম্প তা খাটো করে দেখিয়েছিলেন।
এএফপির এক সাংবাদিক ইরানের প্রসঙ্গ আলোচনায় তুলবেন কি না জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, তিনি এ বিষয়ে এবং আরও অনেক বিষয়ে কথা বলবেন। তাঁর ভাষায়, বিষয়টি অন্য সবকিছুর মতোই ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে গত বছর ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তেজনা প্রশমনে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বুধবার জানান, শীর্ষ বৈঠকের আগে ব্যাপক আলোচনার পর দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
বেসেন্ট জানান, ‘অর্থনৈতিক উত্তেজনা প্রশমন’ চুক্তির মেয়াদ ১০ নভেম্বরের পরিবর্তে আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
তবে বড় ধরনের ব্যবসায়িক চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এএফপিকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শি জিনপিংয়ের প্রতিনিধিদলে কোনো চীনা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নেই। অন্যদিকে বড় এআই কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের নির্বাহীরা বৃহস্পতিবারের রাষ্ট্রীয় ভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
শীর্ষ বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে থাকছে। প্রযুক্তিটি মানবজাতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। এআই কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সতর্কবার্তাতেও এ উদ্বেগ জোরালো হয়েছে।
এআই প্রযুক্তিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। দুই দেশই মনে করে, একবিংশ শতাব্দীর বাকি সময়ের জন্য এ প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোববার স্কট বেসেন্ট ও তাঁর চীনা সমকক্ষ হে লাইফেংয়ের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনায় এআই নিয়ে উদ্বেগ মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের একটি মাধ্যম প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আলোচনা হয়।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জোনাথন চী এএফপিকে বলেন, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও উত্তেজনা কমানোর একটি ‘জেন্টলম্যানস অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা অলিখিত সমঝোতা আরও বিস্তৃত করাই সামগ্রিক লক্ষ্য।
শি জিনপিংকে ট্রাম্পের জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা তাঁর নিজ দলের চীনবিষয়ক কট্টরপন্থীদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার জন্য বেইজিং ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে বলে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর এ সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকার বলেন, ট্রাম্পের মনে রাখা উচিত, তাঁর অতিথি একজন নিষ্ঠুর, অনির্বাচিত ও নিপীড়নকারী স্বৈরশাসক।
তবে ট্রাম্পের জন্য শির সফর দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার পরিবর্তে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ও কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগও তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর জনসমর্থন ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।
পোপের সফর ছাড়া ১৯৬২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে সর্বশেষ কোনো বিদেশি নেতাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবে গত বছর আলাস্কায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিমান থেকে নামার সময় ট্রাম্প নিজে তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।
মন্তব্য করুন