একটি শিশু নিখোঁজ হওয়া মানে শুধু একটি পরিবারের সন্তান হারানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিরাপত্তাহীনতা, মানসিক বিপর্যয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশে নিখোঁজ শিশুদের ঘটনায় দ্রুত অনুসন্ধান, সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকি প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের সমন্বিত ভূমিকা জরুরি।
নিকোলাস বিশ্বাস
একটি শিশু নিখোঁজ হলে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়ে তার পরিবার। সন্তানকে খুঁজতে বাবা-মা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে দেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন থেকে যায়—একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা কতটা দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে সুরক্ষার দায়িত্বই বা কতটা কার্যকরভাবে পালন করা হচ্ছে?
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান তখনও মেলেনি।
তবে থানায় নথিভুক্ত জিডির সংখ্যা দিয়ে নিখোঁজ শিশুর প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। কোনো কোনো ঘটনার তথ্য সময়মতো হালনাগাদ নাও হতে পারে। আবার অনেক ঘটনা থানায় রিপোর্টই নাও হতে পারে।
সব নিখোঁজ শিশুর ঘটনা একই ধরনের নয়। কেউ পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যার কারণে বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে। আবার কেউ অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন কিংবা শোষণের শিকার হতে পারে। তাই শুধু কতজন শিশু নিখোঁজ হয়েছে তা জানাই যথেষ্ট নয়; তাদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ, পরবর্তী পরিস্থিতি এবং উদ্ধারের ব্যবস্থাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
শিশুরা সবসময় নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে তাদের সহজেই বিপদে ফেলা সম্ভব। বিশেষ করে দরিদ্র, পথশিশু, প্রতিবন্ধী এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনাকে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ। বিলম্ব হলে শিশুকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা পাচারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সাধারণ ডায়েরি করা পুলিশের কাজের শেষ নয়, বরং অনুসন্ধানের শুরু। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন।
সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা-মা পুলিশের কাছে গেলে তাদের সঙ্গে সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। উদাসীনতা, অযথা সন্দেহ কিংবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিবারের সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকলে তিনি পরিবারকে অনুসন্ধানের অগ্রগতি জানাতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
অসহায় মা-বাবার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হচ্ছে এবং সন্তানের সন্ধানে কার্যকরভাবে কাজ চলছে, এমন আস্থা তৈরি করা।
নিখোঁজ শিশু উদ্ধার হয়ে পরিবারের কাছে ফিরে এলে স্বস্তি ফিরলেও দায়িত্ব সেখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল, কার সঙ্গে ছিল এবং সে কোনো ধরনের নির্যাতন, ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে শিশুবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ, ভয় দেখানো কিংবা ঘটনার জন্য দায়ী করা উচিত নয়। প্রয়োজনে তার চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা ও নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
শিশুটি কেন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল তা চিহ্নিত না করে শুধু তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকি আবার তৈরি হতে পারে।
যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও সামাজিক কলঙ্ক অনেক সময় সত্য প্রকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পারিবারিক অসম্মানের আশঙ্কায় অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না। কখনো আবার শিশুকেই ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়।
এই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। শিশুদের বোঝাতে হবে, কেউ তাকে ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে বা কোনো বিষয় গোপন রাখতে বললে তা বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানানো উচিত। একই সঙ্গে শিশু কোনো ঘটনা জানালে বড়দেরও সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল ও মাদ্রাসায় কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি থাকা এবং শিক্ষক-কর্মীদের নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত করা, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া জানানো ও শিশুর গোপনীয়তা রক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কেও শিশুদের সচেতন করা জরুরি।
একটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় করা সম্ভব। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ফুটেজও নিখোঁজ শিশুর সন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিতে পারে।
ঢাকার কোনো থানায় একটি শিশু নিখোঁজ হলে তথ্যটি যেন শুধু ওই থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। শিশুটিকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিট ও এলাকাগুলোকে অবহিত করা প্রয়োজন।
চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ শিশু সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। তবে গ্রামীণ এলাকার কতজন শিশু ও অভিভাবক এই নম্বর সম্পর্কে জানেন, তা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ১০৯৮ নম্বর দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা যেতে পারে। শিশুদের কাছে বার্তাটি হওয়া উচিত সহজ—বিপদে নীরব না থেকে সাহায্য চাইতে হবে।
শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও গণমাধ্যম—সবারই এখানে ভূমিকা রয়েছে।
স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিতে থাকা শিশু শনাক্ত করে তাদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
অন্যদিকে, গণমাধ্যমে নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি। এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধার করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আরও বড় সাফল্য হবে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে তা প্রতিরোধ করা যায়।
এমন পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুরক্ষিত থাকবে এবং অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখার বিষয়ে সচেতন থাকবে। নির্যাতনের শিকার হলে সে যেন ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারে। শিশু কথা বললে তাকে দোষী হিসেবে নয়, সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে দেখতে হবে।
শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার বলে উল্লেখ করেছেন। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে শুধু ‘শিশুটি কোথায়?’—এই প্রশ্ন করলেই হবে না। পাশাপাশি জানতে হবে, ‘কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?’
শিশুর ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়ায় বিলম্বের সুযোগ নেই। নিখোঁজ শিশুকে দ্রুত খুঁজে বের করা যেমন জরুরি, তেমনি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার।
নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddzam@gmail.com
মন্তব্য করুন