ভারতের রাজনীতিতে আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তার দাবি, এ সময়ে এমন কিছু ঘটতে পারে, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের জন্য অনুকূল হবে না।
৩০ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে বিরোধী নেতাদের সঙ্গে আলোচনার সময় রাহুল গান্ধী এ মন্তব্য করেন বলে বৈঠকে উপস্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আজতক ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
বৈঠকে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় চলমান আন্দোলনের গতি আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন রাহুল।
আজতকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাহুল বৈঠকে দাবি করেন, বিরোধীদের আন্দোলন প্রভাব ফেলছে এবং সরকার চাপের মধ্যে রয়েছে। তিনি আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আগামী ছয় থেকে আট মাসে এমন কিছু ঘটতে পারে, যা মোদি ও অমিত শাহের জন্য অনুকূল হবে না বলে মন্তব্য করেন।
তবে ওই সময়ের মধ্যে কী ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, সে বিষয়ে রাহুল বৈঠকে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিয়েছেন কি না, তা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। তার বক্তব্যের তথ্যগুলো মূলত বৈঠকে উপস্থিত সূত্রের বরাতেই প্রকাশিত হয়েছে।
বৈঠকে রাহুল আরও দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের বিরুদ্ধে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন, সিবিআই ও এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের কর্মকর্তারাও বিভিন্ন তথ্য তার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। বিরোধী নেতাদের কাছেও থাকা তথ্য পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করে সরকারের বিরুদ্ধে যৌথভাবে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে বিরোধী দলগুলোর ঐক্যের ওপর জোর দেন রাহুল। বিভিন্ন রাজ্যে শরিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও নির্বাচন কমিশন ও ভোটার তালিকার মতো জাতীয় ইস্যুতে সবাইকে একসঙ্গে থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়। ইভিএম নিয়ে অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে রাহুল দক্ষিণ কলকাতার একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন বলে সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। তবে ইভিএমে কারচুপির অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই এবং নির্বাচন কমিশনও বিরোধীদের এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়।
বৈঠক শেষে দেশজুড়ে যৌথ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে ইন্ডিয়া জোট। আগামী ২ থেকে ৮ অক্টোবর বিভিন্ন জেলায় ‘গণতন্ত্র রক্ষার পদযাত্রা’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৬ অক্টোবর বিরোধী সাংসদদের নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের দিকে মিছিল করার কর্মসূচি রয়েছে।
ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতেও বিরোধী দলগুলো একমত হয়। পাশাপাশি এসআইআর প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ব্যালট পেপার ফিরিয়ে আনার দাবিও জানানো হয়।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও জোরদার করার পক্ষে মত দেন। ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বৈঠকে রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও আলোচনা হয়। ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলো অনেক রাজ্যে পরস্পরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় প্রতিটি রাজ্যে একই ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে বলে নেতারা আলোচনা করেন। তবে জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের ঐক্য ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাহুল গান্ধী বলেন, এই লড়াই আরও বড় আকার নিচ্ছে এবং সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষায় বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। বৈঠকের পর তিনি বলেন, ইন্ডিয়া জোটের নেতারা সংবিধান রক্ষায় সম্মিলিতভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কয়েক মাসের মধ্যে দেশে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈঠকে বিরোধী দলগুলোর ঐক্য আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন রাহুল। নির্বাচন কমিশন, সিবিআই ও ইডির কিছু কর্মকর্তা তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য দিচ্ছেন বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে, বিজেপি ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক ও বিরোধীদের আন্দোলন নিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান এসআইআর-বিরোধী অবস্থানের সমালোচনা করে ভোটার তালিকা নির্ভুল রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
এদিকে, বৈঠকে রাহুল গান্ধীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্ডিয়া জোটের নেতা ঘোষণা করা হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। তবে বৈঠকে তার সক্রিয় ভূমিকা এবং বিরোধীদের আন্দোলনে সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তথ্যসূত্র: আজতক, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, এএনআই
মন্তব্য করুন