সাত দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় বেড়েছে সিলিন্ডার কেনার চাপ। এ পরিস্থিতিতে ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
সাত দফা দাবিতে দুই দিন এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার কেনার চাপ বেড়েছে। কোথাও ক্রেতার সংখ্যা বাড়লেও কোথাও বিক্রি রয়েছে স্বাভাবিক। তবে বাড়তি চাহিদার সুযোগে কিছু দোকানে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর, ফার্মগেট ও কদমতলী থানার জুরাইন এলাকার বিভিন্ন এলপিজি বিক্রির দোকান ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বিক্রেতারা জানান, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিক্রি বন্ধ থাকার ঘোষণায় অনেক গ্রাহক আগেভাগেই সিলিন্ডার কিনছেন। বিশেষ করে যেসব বাসাবাড়িতে গ্যাস শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব গ্রাহক আগে থেকেই সিলিন্ডার সংগ্রহ করছেন। তবে বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে কিছু দোকানে দাম বাড়ানোর অভিযোগও উঠেছে।
মিরপুর-১০-এর সেনপাড়ার খুচরা গ্যাস বিক্রেতা আবিদ আলী বলেন, দুই দিন বিক্রি বন্ধ থাকার ঘোষণার পর ক্রেতারা বেশি করে গ্যাস কিনতে আসছেন। অনেকেই জানতে চাইছেন, কত দিন গ্যাস বিক্রি বন্ধ থাকবে।
তিনি জানান, বাসায় পৌঁছে দিয়ে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন। গত এক মাস ধরে গ্যাসের সরবরাহ কম বলে দাবি করে আবিদ আলী বলেন, ঢাকার ভেতরে সংকট বেশি থাকায় ঢাকার বাইরে থেকে গ্যাস এনে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
তার দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও অন্য মাপের সিলিন্ডার ছিল না। কয়েকটি সিলিন্ডারে গ্যাস থাকলেও দোকানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সিলিন্ডার খালি পড়ে থাকতে দেখা যায়।
মিরপুরের শেওড়াপাড়ার কয়েকটি দোকানেও ক্রেতার চাপ কিছুটা বেড়েছে। সেখানে চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি দুই দিন বিক্রি বন্ধের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বেগম রোকেয়া সরণির ডিলার এনামুল হক বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করে ব্যবসায়ীদের লাভ খুবই কম থাকে। দোকানভাড়া, পরিবহন খরচ ও কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর সিলিন্ডারপ্রতি প্রায় ৪০ টাকা লাভ থাকে বলে দাবি করেন তিনি।
এনামুল হক বলেন, সরকার তাদের কাছে ১ হাজার ৭৪২ টাকা রেখে ১ হাজার ৮৩৭ টাকায় ১২ কেজির গ্যাস বিক্রি করতে বলে। কিন্তু দোকানভাড়া, পরিবহন খরচ ও কর্মচারীদের বেতনসহ বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে এ অর্থ যথেষ্ট নয়।
তিনি জানান, তার দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ১৫০ টাকা এবং ৩৫ কেজির সিলিন্ডার ৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাত দফা দাবিতে তাদের কর্মসূচি চলছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিক্রি বন্ধ থাকবে। দাবি পূরণ না হলে লাগাতার কর্মসূচি দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
কদমতলী থানার জুরাইনের বিসমিল্লাহ ট্রেডের স্বত্বাধিকারী মাহফুজ আলম বলেন, দুই দিন বিক্রি বন্ধের ঘোষণা আসার পর থেকেই সিলিন্ডার কেনার চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে হোটেল ব্যবসায়ীরা বেশি সিলিন্ডার কিনছেন।
তিনি জানান, সাধারণত হোটেল ব্যবসায়ীরা খালি সিলিন্ডার দিয়ে ভর্তি সিলিন্ডার নিয়ে যান। কিন্তু গত সোমবার থেকে কেউ কেউ দুটি খালি সিলিন্ডারের বিপরীতে দুটি ভর্তি সিলিন্ডার নিচ্ছেন। এতে বিক্রির চাপ বেড়েছে।
মাহফুজ আলম বলেন, তারা অতিরিক্ত সিলিন্ডার মজুত রাখেননি। তাই চায়ের দোকানদার ও বাসাবাড়ির গ্রাহকদের কথা বিবেচনা করে সীমিত পরিমাণে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। জনভোগান্তির কথা বিবেচনা করে সরকার ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো মেনে নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জুরাইনের জনি চায়ের দোকানের মালিক জনি বলেন, বেশি সিলিন্ডার কিনে মজুত করার মতো পুঁজি তার নেই। মঙ্গলবার দোকানের গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন সিলিন্ডার কিনতে এসেছেন তিনি।
অন্যদিকে, ফার্মগেটের রাজাবাজার এলাকার খুচরা গ্যাসের দোকানগুলোতে মঙ্গলবার বাড়তি ক্রেতার চাপ দেখা যায়নি। আনারুল নামের এক বিক্রেতা বলেন, তার দোকানে ক্রেতার সংখ্যা এখনো স্বাভাবিক রয়েছে। প্রতিদিনের মতোই দু-একজন ক্রেতা আসছেন। তবে বুধবার ক্রেতার চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
বিক্রেতাদের কয়েকজন মনে করছেন, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিক্রি বন্ধ থাকলে বুধবার সিলিন্ডার কেনার চাপ আরও বাড়তে পারে। চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে বাজারে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে সরবরাহ ও বিক্রির তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এর আগে গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সাত দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি।
ব্যবসায়ীদের সাত দফা দাবি
সমিতির দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, লাইসেন্স ফি, সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো এবং অব্যবহৃত সিলিন্ডারের লোকসানসহ বিভিন্ন ব্যয় বিবেচনায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা ৭ শতাংশ করা।
এ ছাড়া কোম্পানিগুলো মাসে একাধিকবার এলপিজির দাম সমন্বয় করলে তা বিইআরসির ঘোষণার মাধ্যমে কার্যকর করা এবং দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সরবরাহে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর সিলিন্ডার সরকারিভাবে অথবা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে রিফিলের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে সমিতি।
কোম্পানির সরবরাহ করা চালানে পণ্যের প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করা এবং পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত গ্যাস পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ন্যায্য পরিবহন ভাড়া দেওয়ার দাবিও রয়েছে তাদের।
পাশাপাশি গ্যাস সিলিন্ডার বহনকারী পিকআপ বা ট্রাকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে শুধু রেলিং না থাকার অজুহাতে ট্রাফিক পুলিশের মামলা বন্ধ করা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের ওপর অনৈতিক ও অযৌক্তিক জরিমানা আরোপ বন্ধের দাবি জানিয়েছে সমিতি।
ব্যবসায়ীদের এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন