আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম, পরিবহন ও বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভর্তুকির চাপ সামলাতে দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার। নতুন মূল্য ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ নিয়ন্ত্রণে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করেছে সরকার। এর আগে দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রি অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
নতুন সমন্বয় অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন মূল্য ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দরের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করা হলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ২০৫ টাকা হওয়ার কথা। তবে সাধারণ মানুষ, গণপরিবহন ও সেচনির্ভর কৃষকের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এর চেয়ে কম দামে ডিজেল সরবরাহ করছে। ফলে মূল্য সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারকে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভোক্তার ওপর না দিয়ে সরকার এখনো এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বহন করছে। এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়লেও জনস্বার্থ বিবেচনায় দেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। ফলে বিপিসি অতীতে অর্জিত অতিরিক্ত অর্থ ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় লোকসান সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আমেরিকা-ইসরাইল ও ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমেছে। দেশের আমদানিকৃত জ্বালানির ৭০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ২০ শতাংশ এই রুট দিয়ে পরিচালিত হয়।
একই সময়ে ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সংঘাত এবং বাব-এল-মান্দেব ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে লোহিত সাগরেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণে অনেক জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প পথে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি, বীমা ব্যয় ও ফ্রেইট চার্জ বেড়েছে।
জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়। এর মধ্যে ডিজেল প্রায় ৪৫ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দরের সঙ্গে দেশের বাজারদরের বড় ব্যবধান বিপিসির আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছিল। মূল্য সমন্বয় না করা হলে শুধু ডিজেলেই বার্ষিক লোকসান প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারত।
বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজ ভাড়া বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই দেশে তেলের মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।
তিনি জানান, গত ছয় মাসে বিপিসির মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। লোকসানের এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের জ্বালানি খাতে মারাত্মক সংকট তৈরি হতে পারত।
রফিকুল ইসলাম বলেন, তেলের মূল দামের পাশাপাশি তা হ্যান্ডেলিংয়ের খরচও অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। আগে যেখানে জাহাজ ভাড়া ছিল ৩ থেকে ৪ ডলার, তা বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে মূল্য সমন্বয় না করে বিদ্যমান দাম বহাল রাখলে বিপিসিকে প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হতো।
জ্বালানি তেল বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রি হওয়ায় সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ের আশঙ্কা থাকে, অন্যদিকে ভর্তুকির সুবিধা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডিজেলের দাম অনেক আঞ্চলিক ও এশীয় দেশের তুলনায় কম। বাংলাদেশি মুদ্রায় কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সচিবালয়ে বলেছেন, একই সঙ্গে বিপুল ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অর্থায়নের সক্ষমতাও চাপে পড়তে পারে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা তেল প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। ফলে দাম সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের দরের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরোপুরি সমন্বয় করা হলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০৫ টাকা নির্ধারণ করতে হতো। তবে সাধারণ মানুষ, গণপরিবহন ও সেচনির্ভর কৃষকের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করছে।
বিভাগটি আরও জানায়, অতীতে বিপিসির অর্জিত অতিরিক্ত অর্থ সংরক্ষিত থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের লোকসান সত্ত্বেও এতদিন মূল্য না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি সমন্বয় না করে জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা সমন্বয় করায় বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে। এতে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা কিছুটা স্বস্তি পাবে এবং জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন আরও টেকসইভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
সরকারের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির পুরো চাপ যাতে জনগণের ওপর না পড়ে। একই সঙ্গে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং সরকারের অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক ব্যয়ও যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই সীমিত পরিসরে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমে এলে দেশের বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম পুনরায় সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে। বর্তমান মূল্য সমন্বয়কে স্থায়ীভাবে উচ্চমূল্য ধরে রাখার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র যাতে অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া আদায় বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর মাধ্যমে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, মূল্য সমন্বয়ের অনিবার্য প্রভাব যাতে অযৌক্তিকভাবে বেড়ে সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, তা নিশ্চিত করা।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি খাতে ব্যয় ও ভর্তুকির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজার, বিপিসির আর্থিক পরিস্থিতি এবং জনগণের সক্ষমতা—এই তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়েই মূল্য সমন্বয়ের নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বিপিসির সংকট এড়াতে তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প ছিল না জানিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বাসসকে বলেন, বিপিসির আর্থিক সংকট এবং দেশে সম্ভাব্য জ্বালানি ঘাটতি এড়াতে তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের হাতে অন্য কোনো ভালো বিকল্প ছিল না। আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চ মূল্যের কারণে দেশীয় বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের এই প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, সরকার যদি এখন তেল আমদানি করতে না পারত, তবে দেশ আরও বড় ও ভয়াবহ সংকটে পড়ত, যা দেশের প্রতিটি নাগরিককে চরম ভোগান্তিতে ফেলত।
বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি নিয়ে ড. ইজাজ হোসেন আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হবে না। বিশেষ করে মার্কিন নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক সংকট বা যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে। এটি পৃথিবীর পাশাপাশি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বড় ‘শক’ বা ধাক্কা হলেও সাময়িকভাবে তা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
মন্তব্য করুন