হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতাদের এলএনজি সরবরাহে ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ আরও এক মাস বাড়িয়েছে কাতার। এতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের কিছু নির্ধারিত এলএনজি কার্গো নভেম্বর পর্যন্ত বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতালির এডিসন জানিয়েছে, কাতার থেকে তাদের এলএনজি সরবরাহ ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন অব্যাহত থাকায় এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতাদের এলএনজি সরবরাহে ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ নোটিসের মেয়াদ আরও এক মাস বাড়িয়েছে কাতারএনার্জি। এর ফলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের কিছু নির্ধারিত এলএনজি কার্গো নভেম্বর পর্যন্ত বাতিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে ব্লুমবার্গ ও রয়টার্স জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কাতারএনার্জি চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্রেতাদের জানিয়েছে, এলএনজি কার্গো বাতিলের সিদ্ধান্ত নভেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। সংশ্লিষ্ট আরও দুটি সূত্র জানিয়েছে, ভারতের অন্তত একজন ক্রেতাকেও একই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
এদিকে ইতালির জ্বালানি কোম্পানি এডিসন জানিয়েছে, কাতার থেকে তাদের এলএনজি সরবরাহ ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। তবে কাতারএনার্জি এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কাতারএনার্জি তাদের এলএনজি গ্রাহকদের সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত অবহিত করছে। প্রায় প্রতি মাসেই নির্ধারিত কিছু কার্গো বাতিল বা সরবরাহ স্থগিত করা হচ্ছে। এর আগে জারি করা ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ নোটিসের মেয়াদও ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে আরও এক মাস মেয়াদ বাড়ানোর ফলে এশিয়া ও ইউরোপের এলএনজি ক্রেতাদের অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হলো।
‘ফোর্স ম্যাজিউর’ বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কোনো কারণে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ বা দায়িত্ব পালন সম্ভব না হলে নির্দিষ্ট কিছু চুক্তিগত দায় থেকে সাময়িক অব্যাহতি পাওয়া যায়।
চলতি মাসে কাতার হরমুজ প্রণালী দিয়ে এলএনজি পরিবহন কিছুটা বাড়াতে সক্ষম হলেও যুদ্ধ শুরুর আগের স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সরবরাহ এখনও অনেক কম। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়। গত বছর বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়েছিল।
ফলে হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে কাতারের রপ্তানির পাশাপাশি বৈশ্বিক এলএনজি বাজারেও সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখনও সমঝোতা হয়নি। ইরান জানিয়েছে, হরমুজ পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তারা তাদের শর্ত শিথিল করবে না। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে পরস্পরবিরোধী ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত থাকায় এলএনজি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। ইউরোপ ও এশিয়ায় এলএনজির দাম ২০২২ সালের শেষ দিকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি উঠেছে। সামনে শীত মৌসুম থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উত্তর গোলার্ধে শীত শুরু হলে ঘরবাড়ি গরম রাখা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গ্যাসের চাহিদা বাড়বে। এ সময় কাতারের মতো বড় সরবরাহকারীর এলএনজি রপ্তানি কমে গেলে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহে ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এলএনজির দাম বাড়লে এর প্রভাব বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ভোক্তা পর্যায়ের বিলেও পড়তে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলো এ ধরনের পরিস্থিতিতে তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মতো এশীয় দেশগুলো কাতারের এলএনজির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ বাতিলের সিদ্ধান্ত তাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালীর সংকটের পাশাপাশি কাতারের এলএনজি উৎপাদন অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্চে হামলার পর দেশটির প্রধান এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্র রাস লাফান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে সেখানে কম উৎপাদন সক্ষমতায় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে কাতারএনার্জি স্থাপনাটিকে এমনভাবে প্রস্তুত রাখছে, যাতে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে গেলে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো যায়। ফলে হরমুজ প্রণালীর বাধা দূর হলেও কাতারের এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
মন্তব্য করুন