শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিতে রাজধানী ঢাকা ছেড়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। এতে বাজারে সবজির চাহিদা প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে দাম পড়ে গেছে। অবিক্রীত পণ্য কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে লোকসানে পড়ছেন ব্যবসায়ী ও আড়তদারেরা।
শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটির প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সবজি ও কাঁচামালের বাজারে। বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়ে যাওয়ায় বাজারে ক্রেতা কমেছে। পাইকারি ব্যবসায়ীদের হিসাবে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সবজির চাহিদা কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে, ছুটির সময়ে চাহিদা সঠিকভাবে অনুমান করতে না পারায় রাজধানীতে পণ্য পরিবহনের পরিমাণও কমেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, রাজধানীর বাইরে থেকে সবজির সরবরাহ কমেছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। তবে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি কমে যাওয়ায় বাজারে অবিক্রীত সবজির পরিমাণ বেড়েছে। এতে পাইকারি পর্যায়ে দাম কমে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীকে লোকসানে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ প্রধান পাইকারি বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। এদিন বেলা ১১টার দিকে কারওয়ান বাজারে অনেক ব্যবসায়ীকে বেচাকেনা শেষে হিসাব মেলাতে দেখা যায়। ব্যবসায়ী, আড়তদার ও পাইকারি বিক্রেতারা জানান, ক্রেতা কম থাকায় প্রায় সব ধরনের সবজি আগের তুলনায় কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলের বাজারেও পড়েছে ছুটির প্রভাব।
দীর্ঘ ছুটিতে চীন থেকে আমদানি করা গাজরের দাম ও বিক্রি—দুটিই কমেছে। গত সপ্তাহে ১০ কেজির এক প্যাকেট গাজর ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বুধবার সকালে তা কমে ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় নেমে আসে।
পাইকারি গাজর বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, আমদানি একই থাকলেও বিক্রি কমেছে। ক্রেতা কমে যাওয়ায় দামও কমেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা চাহিদা কম থাকায় আগের তুলনায় কম গাজর কিনছেন। গত মঙ্গলবার থেকে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রাতে ঢাকার বাইরে থেকে আসা সবজি কারওয়ান বাজারের আড়তে পৌঁছায়। সেখান থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সবজি বিক্রি করেন আড়তদার মেহেদি হাসান জুয়েল। তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি করল্লা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। স্বাভাবিক কর্মদিবসে একই করল্লার দাম থাকে ৫৫ টাকা। দাম কমার পাশাপাশি বিক্রির পরিমাণও কমেছে। সাধারণ কর্মদিবসে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মণ করল্লা ও উচ্ছে বিক্রি হলেও ছুটির কারণে তা কমে সাত থেকে আট মণে নেমেছে।
আড়তদার সোহেল রানাও একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। তাঁর আড়তে করল্লার পাশাপাশি উচ্ছে, পটল ও বেগুন বিক্রি হয়। তিনি বলেন, প্রতি কেজি ৫৫ টাকার উচ্ছে এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। ২০ থেকে ২৫ টাকার পটল কমে বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ টাকায়। আর ৩০ থেকে ৩৫ টাকার বেগুনের দাম নেমে এসেছে ২৫ টাকায়।
সোহেল রানা জানান, ছুটির কারণে রাজধানীর বাইরে থেকে সবজির সরবরাহ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। তবে চাহিদা কমেছে আরও বেশি। ফলে বাজারে অনেক সবজি অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে।
ছুটির প্রভাব পড়েছে কাঁচা মরিচের বাজারেও। কারওয়ান বাজারে ভালো মানের কাঁচা মরিচ পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক কম মানের মরিচের দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা। গত সপ্তাহে একই মানের মরিচ কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল। পাইকার মো. বিপুল বলেন, ছুটির কারণে কাঁচা মরিচের দাম কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে সরবরাহও কিছুটা কমেছে।
রাজধানীর অন্যতম বড় পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারে আলুর দামও কমেছে। বর্তমানে আড়ত থেকে খুচরা বিক্রেতারা প্রতি কেজি আলু কিনছেন ১৬ টাকায়। গত সপ্তাহে একই আলু কেজিতে এক থেকে দুই টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। পাইকারি বিক্রেতা আছির আলী জানান, সাধারণ কর্মদিবসে প্রতিদিন ১০ বস্তা আলু বিক্রি হলেও ছুটির কারণে তা কমে পাঁচ বস্তায় নেমেছে।
ছুটির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে লাউয়ের বাজারে। বুধবার সকালে প্রতিটি লাউ ১০ টাকায় বিক্রি হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে পাঁচ টাকায় নেমে আসে। ক্রেতা আকৃষ্ট করতে পাইকার মো. মাকসুদকে পাঁচ টাকায় লাউ বিক্রির জন্য হাঁকডাক করতে দেখা যায়। এরপরও কারওয়ান বাজারের মেঝেতে অনেক লাউ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
মাকসুদ জানান, সাধারণ কর্মদিবসে আকারভেদে প্রতিটি লাউ ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হতো। কিন্তু ছুটির কারণে ক্রেতা কমে যাওয়ায় এখন অনেক কম দামে লাউ বিক্রি করতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজার ক্ষুদ্র কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. ওমর ফারুক বলেন, দীর্ঘ ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়ে যাওয়ায় বাজারে চাহিদা কমেছে। তবে সেই অনুপাতে রাজধানীর বাইরে থেকে সবজির সরবরাহ কমেনি। ফলে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।
তিনি দিনের সংবাদকে জানান, কারওয়ান বাজারে প্রতিদিন শাকসবজিবোঝাই চার শতাধিক ট্রাক আসে। এসব ট্রাকে প্রায় সাত হাজার টন সবজি থাকে। এ ছাড়া প্রতিদিন আরও প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টন বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ও অমৌসুমি ফল আসে।
ওমর ফারুকের হিসাব অনুযায়ী, সবজির সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমলেও দীর্ঘ ছুটিতে চাহিদা কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ফলে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৮৬০ টন সবজি অতিরিক্ত থেকে যাচ্ছে। এসব সবজি ব্যবসায়ীরা কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিক্রি না হওয়ায় পণ্য নষ্টও হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, ছুটির কারণে ক্রেতার সংখ্যা ও চাহিদা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাইকারি বাজারে সবজির দাম ও বিক্রির ক্ষেত্রে এমন অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।
মন্তব্য করুন