
শারদীয় দুর্গোৎসব সামনে রেখে চট্টগ্রামে দিন-রাত প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। কর্ণফুলীর কাদামাটি দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা তৈরির কাজও চলছে।
শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে এখন প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততা। রাতজেগে মাটির প্রতিমায় শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়া দিচ্ছেন কারিগররা। একই সঙ্গে নগরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলছে সাজসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ।
সিআরবির সাত রাস্তার মোড়, শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ নিতাইগৌর বন্ধুকুঞ্জ আশ্রম, সদরঘাট কালীবাড়ী, ঘোষ বাড়ি, হাজারী লেইন, দেওয়ানজী পুকুর পাড় ও চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ চলছে।
শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ নিতাইগৌর বন্ধুকুঞ্জ আশ্রমে এবার অর্ধশতাধিক দুর্গাপ্রতিমা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৃৎশিল্পী তুলসী রঞ্জন পাল (৮৬)। খুলনার বাগেরহাটের এই শিল্পী জানান, বাবার কাছ থেকে তিনি প্রতিমা তৈরির কাজ শিখেছেন। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি এখানে কাজ করছেন।
তুলসী রঞ্জন পাল বলেন, এখানে প্রতিমার বায়না নেওয়া থেকে শুরু করে তা বুঝিয়ে দেওয়া পর্যন্ত সব দায়িত্ব তাঁর। বাসন্তী পূজার পর থেকেই দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ১০ থেকে ১২ জন কারিগর দিনরাত কাজ করলেও নির্ধারিত সময়ে সব প্রতিমা বুঝিয়ে দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত।
তিনি জানান, মাটির তৈরি শাড়িসহ প্রতিমা তৈরির কাজও তারা করেন। এ ধরনের প্রতিমা তৈরিতে সময় ও শ্রম বেশি প্রয়োজন হলেও এর কদর কমে যাচ্ছে। বর্তমানে বাজার থেকে কেনা শাড়ি ও গয়না দিয়ে দেবী দুর্গাকে সাজানোর প্রচলন বেশি।
প্রতিমা শিল্পে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন এই শিল্পী। তাঁর ভাষ্য, ছেলেরা চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় প্রতিমা তৈরির কাজে তাদের আগ্রহ নেই। এতে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই শিল্প ও ঐতিহ্য রক্ষা নিয়ে তিনি চিন্তিত।
নিতাইগৌর বন্ধুকুঞ্জ আশ্রমে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার বিভিন্ন নির্দেশনাও টাঙানো হয়েছে। এতে দেবী দুর্গা, মহিষাসুর, অসুরসহ অন্যান্য দেব-দেবীর প্রতিমা নির্মাণে শাস্ত্রীয় রূপ ও প্রচলিত শিল্পরীতি যথাযথভাবে অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, প্রতিমার চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট মণ্ডপ কমিটি ও থানা পূজা উদযাপন পরিষদের পরামর্শ নিতে হবে। এমন কোনো উপাদান বা অবয়ব প্রতিমায় ব্যবহার করা যাবে না, যাতে কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়। শাস্ত্রীয় কাঠামো অনুসরণ না করে কোনো আঞ্চলিক কমিটি নিজেদের ইচ্ছামতো বা বিকৃতভাবে প্রতিমা তৈরির নির্দেশ দিলে তাৎক্ষণিক মহানগর পূজা কমিটিকে জানানোর অনুরোধও করা হয়েছে।
দুর্গাপ্রতিমার চোখে রং-তুলির কাজ করছিলেন শুভ পাল। তিনি জানান, প্রযুক্তির প্রভাব পড়েছে প্রতিমা তৈরির কাজেও। আগে প্রতিমা তৈরির পর রোদে শুকানো হলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে এখন গ্যাসের তাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিমার মুখের অংশ ডাইসে তৈরি হলেও শিল্পীর হাতের কাজের কদর আলাদা বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শরীয়তপুরের মঙ্গল পাল (৬০) গত ৪০ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, বাঁশ, কাঠ, খড়, মাটি, রং, কাপড় ও সাজসজ্জাসহ প্রতিমা তৈরির প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। আগে যে মাটি ১০ হাজার টাকায় কেনা যেত, এখন তা কিনতে ১২ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে প্রতিমা তৈরির কাজ আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাজারী লেইনের একটি পূজামণ্ডপে সরেজমিনে দেখা গেছে, সেখানে নান্দনিকভাবে প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি মণ্ডপ সাজানোর কাজও চলছে। মণ্ডপের এক দায়িত্বশীল কর্মী জানান, তাদের প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে। তবে এবারের পূজায় কোন বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, তা এখনই জানাতে চাননি তিনি। এ জন্য আরও প্রায় এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে বলে জানান।
আগামী ১০ অক্টোবর শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীর আবাহন হবে। ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গোৎসব। পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসব ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে।