প্রিন্ট এর তারিখঃ Oct 19, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Sep 21, 2026 ইং
জিয়ার জাতিসংঘ ভাষণে স্বনির্ভরতা ও দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার আহ্বান

১৯৮০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রথম ভাষণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বনির্ভর উন্নয়ন, কৃষি ও গ্রামীণ অগ্রাধিকার এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের উন্নয়নের নানা প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরার পাশাপাশি স্বনির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
জাতিসংঘের ওই ভাষণে বাংলাদেশের জনসংখ্যার চাপ, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা এবং নিম্ন মাথাপিছু আয়ের মতো চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন জিয়াউর রহমান। এসব সংকট মোকাবিলায় কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা জানান তিনি।
জিয়াউর রহমান বলেন, বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই বাংলাদেশের। দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব জাপান ও নেদারল্যান্ডসের চেয়ে দ্বিগুণ। বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ হয় বেকার, নয় ভূমিহীন কৃষক। তাদের অনেকে কেবল মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ২০ লাখ মানুষের খাদ্যসংস্থানের প্রয়োজন হয়।
তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানান তিনি। জিয়াউর রহমান বলেন, ‘তবুও আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাইনি এবং হবোও না।’
প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার কথাও জাতিসংঘে তুলে ধরেন তিনি। ১৯৮৫ সালের মধ্যে জন্মহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং বিদ্যালয় ও হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানান। একই সঙ্গে কোনো নারী, পুরুষ বা শিশু যাতে খাদ্য, আশ্রয় ও পোশাক থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের অগ্রাধিকার কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন।’ দেশের প্রায় ৯ কোটি মানুষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন তিনি।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে জিয়াউর রহমান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার কোনোমতেই নড়চড় হবে না।’ তিনি স্বনির্ভরতাকে দেশের মূলমন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সফল হতেই হবে, কারণ ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের নেই।’
ভাষণের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রসঙ্গ। আঞ্চলিক শান্তির সঙ্গে জাতীয় উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার সম্পর্ক তুলে ধরে জিয়াউর রহমান এ অঞ্চলে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলের কাছে কিংবা দূরে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অবনতি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।’
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর একটি শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছে উল্লেখ করে জিয়াউর রহমান বলেন, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে উঠলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক ভিত্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তখনও তেমন কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্য হবে একত্রিত হওয়া এবং এ অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক কল্যাণের জন্য সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করা।’
অন্য অঞ্চলের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক সহযোগিতা উত্তেজনা কমাতে এবং অভিন্ন স্বার্থে পরস্পরের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর অবস্থান নমনীয় করতে সহায়তা করেছে।’
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জিয়াউর রহমান বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় এখন আমাদেরও শুরু করার সময় এসেছে।’
বিশ্বের উন্নত উত্তর ও উন্নয়নশীল দক্ষিণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টিও ভাষণে গুরুত্ব পায়। বিশ্বের বড় একটি অংশ দারিদ্র্য ও বঞ্চনার মধ্যে থাকলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে মত দেন জিয়াউর রহমান।
তিনি বলেন, ‘শান্তিকে যেমন খণ্ডিত করা যায় না, তেমনি বিশ্বকে ধনী ও দরিদ্র- এভাবে পৃথক অংশে বিভক্ত করেও রাখা যায় না। এটি করা হলে বিশ্বশান্তি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’
জিয়াউর রহমান ব্রান্ডট কমিশনের সুপারিশের প্রতি সমর্থন জানান। পাশাপাশি উন্নয়ন সহায়তা বাড়ানো, সম্পদ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বৃদ্ধি, ন্যায্যতর বাণিজ্য এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আরও শক্তিশালী সহায়তার ভিত্তিতে নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
উন্নত দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য সহায়তা দ্বিগুণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি তা শর্তহীনভাবে অনুদান হিসেবে দেওয়ার কথা বলেন। একই সঙ্গে স্বল্পমূল্যে তেল সরবরাহ এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জ্বালানি সম্পদ উন্নয়নে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে জিয়াউর রহমান বলেন, তেলের দাম বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সহায়তার ক্ষেত্রে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সাহসী ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান জিয়াউর রহমান। মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও প্রযুক্তি বিশ্বে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমি আন্তরিকভাবে আশা ও প্রার্থনা করি, আমরা যেন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন। এ কারণে জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের জাতিসংঘ ভাষণটি নতুন করে তাৎপর্য বহন করছে।
তারেক রহমান তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা ইস্যু তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। এরপর তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন।
তারেক রহমানের আসন্ন ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সঙ্গে জিয়া পরিবারের চার দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে বিশ্ব সংস্থাটির সামনে বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে দেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন তিনি।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ দিনের সংবাদ অনলাইন